ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ই-কমার্সে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর সহযোগিতা জোরদার
ডিজিটাল পেমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স ও টেলিযোগাযোগে সহযোগিতা জোরদার নিয়ে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে। সোমবার সচিবালয়ে সিঙ্গাপুরের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেরেক লো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে।
২ নভেম্বর সচিবালয়ে সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনারের সঙ্গে আইসিটি মন্ত্রীর বৈঠক; ডিজিটাল পেমেন্ট, এআই, ই-কমার্সে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সিঙ্গাপুরের আগ্রহ
ডিজিটাল পেমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ই-কমার্স ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদার নিয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর। সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সিঙ্গাপুরের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেরেক লো। একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে দুই পক্ষ ডিজিটাল পেমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সরকারি সেবার আধুনিকায়নে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার এবং সারাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবা সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ডাক নেটওয়ার্ককে আধুনিকায়ন করে ই-কমার্স, পার্সেল ডেলিভারি ও সমন্বিত লজিস্টিকসের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি সেবায় ডিজিটাল পেমেন্টের সম্প্রসারণের কথাও বলেন মন্ত্রী। স্বাস্থ্যসেবা ও জনপ্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সিঙ্গাপুরের আগ্রহ
হাইকমিশনার ডেরেক লো বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, রাজস্ব-স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যসেবায় এআই, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বায়োমেডিকেল প্রযুক্তিতে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আগ্রহী সিঙ্গাপুর।
বাংলাদেশের বিস্তৃত ডাক অবকাঠামোকে ই-কমার্স ও লজিস্টিকসের কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রযুক্তি-শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করার ওপরও তিনি জোর দেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফিলিপ ওং, ডেস্ক কর্মকর্তা মৃথিনী টিজিজিআরআইটিএইচএআরএএন এবং এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উন্নয়ন অংশীদার বেঞ্জামিন চু।
ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের যাত্রায় সিঙ্গাপুরের মতো অভিজ্ঞ অংশীদারের সহযোগিতা পেমেন্ট ব্যবস্থা ও ই-কমার্স ইকোসিস্টেমকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডাকঘর থেকে ই-কমার্স হাব
বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ডাক নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ডাকঘরগুলোকে ই-কমার্স, পার্সেল ডেলিভারি ও সমন্বিত লজিস্টিকসের কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের আলোচনায় ছিল। সিঙ্গাপুরের লজিস্টিকস-অভিজ্ঞতা এই রূপান্তরে কাজে লাগতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পণ্য শহর ও বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ডাক-লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্বচ্ছতা
সরকারি সেবায় ডিজিটাল পেমেন্ট সম্প্রসারণের ওপর মন্ত্রীর জোর দেওয়ার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে আনা গেলে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে — এটি বিশ্বের বহু দেশের অভিজ্ঞতা। সিঙ্গাপুর এই ক্ষেত্রে অগ্রণী; তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি-বিশ্লেষকরা।
স্বাস্থ্যসেবা ও জনপ্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্য-তথ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি সেবায় স্বয়ংক্রিয়তা — এআইয়ের প্রয়োগক্ষেত্র বিস্তৃত। তবে প্রযুক্তি আনার পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি, যা নিয়ে ভবিষ্যতে নীতিগত কাঠামো দরকার হবে।
তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তি-শিক্ষা ও দক্ষতায় প্রস্তুত করার ওপর হাইকমিশনারের জোর দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি দিকটি তুলে ধরে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে দক্ষ মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় পুঁজি — এই বার্তাই উঠে এসেছে বৈঠক থেকে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল প্রেক্ষাপট
এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। মোবাইল আর্থিক সেবা এখন শহর থেকে গ্রাম — সর্বত্র পৌঁছে গেছে; অনলাইন কেনাকাটা আর ডিজিটাল পেমেন্ট ধীরে ধীরে নগদ-নির্ভরতার জায়গা নিচ্ছে। এই রূপান্তরকে টেকসই করতে হলে দরকার শক্তিশালী অবকাঠামো, নিরাপদ পেমেন্ট ব্যবস্থা ও দক্ষ জনবল — ঠিক যে ক্ষেত্রগুলোতে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
ই-কমার্স খাতের জন্যও এই সহযোগিতা আশাব্যঞ্জক। ডাকঘরভিত্তিক লজিস্টিকস শক্তিশালী হলে ছোট উদ্যোক্তারা কম খরচে পণ্য পৌঁছে দিতে পারবেন; আর ডিজিটাল পেমেন্ট সহজ হলে ক্রেতার আস্থা বাড়বে। দুই দেশের এই আলোচনা বাস্তব প্রকল্পে রূপ নিলে তার সুফল পাবেন সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে গ্রামীণ উদ্যোক্তা — সবাই।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।