সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

কৃষক কার্ড থাকলেই মোবাইলে আসবে আবহাওয়ার আগাম বার্তা

কৃষক কার্ডধারীদের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় এসএমএসের মাধ্যমে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ছয় ঘণ্টায় এবং দুর্যোগের সময় আরও ঘন ঘন বার্তা পাবেন কৃষকরা।

শেয়ার করুন
কৃষক কার্ড থাকলেই মোবাইলে আসবে আবহাওয়ার আগাম বার্তা

**প্রতি ছয় ঘণ্টায় স্বয়ংক্রিয় এসএমএসে পূর্বাভাস, দুর্যোগে আরও ঘন ঘন সতর্কবার্তা**

কৃষকের মোবাইল ফোনে এবার আবহাওয়ার আগাম বার্তা পৌঁছে দেবে সরকার — খুঁজতে হবে না, বার্তা আসবে নিজে নিজেই। কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত কৃষকদের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠানো হবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস। বৃষ্টি, তাপমাত্রার পরিবর্তন কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক হতে পারবেন তাঁরা, ফলে চাষাবাদ, সেচ, সার প্রয়োগ ও ফসল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আরও নির্ভরযোগ্য।

সোমবার (২ নভেম্বর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক আবহাওয়ায় প্রতি ছয় ঘণ্টা পরপর কৃষকদের মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাঠানো হবে। আর ঝড়, অতিবৃষ্টি বা অন্য কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। এসএমএসের মাধ্যমে এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে দেওয়া হবে — কৃষকদের আলাদাভাবে কোনো তথ্য খোঁজার প্রয়োজন হবে না।

**কেন এই উদ্যোগ**

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন এখনও অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, তাপমাত্রার ওঠানামা ও ঝড় প্রায়ই ফসল ও কৃষিকাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে কৃষকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন — কখন সেচ দেবেন, কখন সার বা কীটনাশক প্রয়োগ করবেন, কখন ফসল কাটবেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফসল কাটার মৌসুমে বৃষ্টির আগাম বার্তা পেলে কৃষক আগেই ফসল কেটে নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারবেন। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে সেচের পরিকল্পনা করা যাবে আরও দক্ষভাবে, ফলে পানির অপচয় কমবে এবং উৎপাদন খরচও কমবে। ঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগের সতর্কবার্তা পেলে ফসল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

**কার্ডের ১০ সেবা**

আবহাওয়ার পূর্বাভাস এই কর্মসূচির অনেকগুলো সেবার একটি মাত্র। কৃষক কার্ডের আওতায় মোট ১০ ধরনের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি উপকরণ সহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ, সেচ সুবিধা ও কৃষিবীমা। লক্ষ্য হলো, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনা।

কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)। কৃষকদের কাছে কৃষি বিষয়ে তথ্য, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনকারী এই প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয় এসএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ করবে। মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে 'পার্টনার' (পুষ্টি, উদ্যোক্তা ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর কর্মসূচি) প্রকল্প।

প্রকল্পটির উপপরিচালক মো. রাকিবুজ্জামান খান বাসসকে বলেছেন, কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও চাহিদা মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়নের কাজ চলছে। নির্ভরযোগ্য ডাটাবেস থাকলে চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির কাজ সহজ হবে।

**কতদূর এগিয়েছে কাজ**

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩ উপজেলার ১ হাজার ৬৮১টি কৃষি ব্লকে তথ্য সংগ্রহের কাজ এগিয়েছে; এর মধ্যে ২২ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ হয়েছে এবং কৃষক কার্ডের সঙ্গে যুক্ত ৯ লাখ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।

গত ১ অক্টোবর ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় একযোগে কর্মসূচির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এই ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৪৭ জনকে কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রি-পাইলটিং কর্মসূচিতে ১০ জেলার ১১ উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষক কার্ড পান; ওই ধাপে ২০ হাজার ৪৮০ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের মধ্যে বার্ষিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে মোট ৫.১২ কোটি টাকা আর্থিক প্রণোদনা বিতরণ করা হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেছেন, কৃষকদের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সমন্বিত সেবা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এতে কৃষকরা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিকাজের পরিকল্পনা করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিরুদ্ধে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসিন বলেছেন, কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের সঠিক রেকর্ড রাখা এবং সরকারি সহায়তা আরও দক্ষ ও সহজলভ্য করা।

কৃষিবিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রান্তিক কৃষকদের একটি বড় অংশ এখনও স্মার্টফোনের বাইরে — তাঁদের জন্য এসএমএসভিত্তিক এই সেবাই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছালে ফসলের ক্ষতি কমবে, উৎপাদন বাড়বে — আর উপকৃত হবেন সেই কৃষক, যাঁর কাছে একটি মোবাইল ফোনই সবচেয়ে বড় 'ডিজিটাল যন্ত্র'।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

পাঠকের মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য সম্পাদকের অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়। শালীন ও বিষয়ভিত্তিক থাকুন।

প্রকাশ করা হবে না।

আমরা নিজেদের প্রতিবেদনের জন্য পেজভিউ ও ভিজিট গণনা করি, তবে শুধু আপনি মেনে নিলে। না বললে গণনা বন্ধ থাকে। বিস্তারিত