অক্টোবরে রপ্তানি আয় ৪ বিলিয়ন ডলার, টানা তৃতীয় মাসে প্রবৃদ্ধি
টানা তৃতীয় মাসে বাড়ল দেশের পণ্য রপ্তানি। অক্টোবরে রপ্তানি আয় ৩.৯৯ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৪.৩৯ শতাংশ। তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাট ও চামড়ার রপ্তানি বেড়েছে। একই মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ২.৮৭ বিলিয়ন ডলার।
**পোশাকের সঙ্গে ওষুধ, পাট ও চামড়ার রপ্তানিও বাড়ছে — তবে উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন, কাগজের প্রবৃদ্ধি কতটা বাস্তব?**
টানা তৃতীয় মাসে বাড়ল বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি। গত অক্টোবরে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় ৪.৩৯ শতাংশ বেড়ে ৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারে (৩৯৯ কোটি ডলার) দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩.৮২ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরের তুলনায়ও আয় বেড়েছে ১.৩৯ শতাংশ — সেপ্টেম্বরে রপ্তানি ছিল ৩.৯৪ বিলিয়ন ডলার।
সোমবার (২ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। সাধারণত রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি); এবারের হালনাগাদ পরিসংখ্যান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশের পণ্য রপ্তানি ৬ শতাংশ বেড়ে ১৭.০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ১৬.০৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চার মাসে অতিরিক্ত এসেছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার।
**যে খাতগুলো এগিয়ে**
রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি যথারীতি তৈরি পোশাক। অক্টোবরে পোশাক রপ্তানি ৪.৯০ শতাংশ বেড়ে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৩.০২ বিলিয়ন ডলার। প্রথম চার মাসে পোশাক রপ্তানির আয় ৫.৮২ শতাংশ বেড়ে ১৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার দাঁড়িয়েছে। নিট পোশাক রপ্তানি অক্টোবরে বেড়েছে ৬.৪৮ শতাংশ, আর ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি ২.৯৬ শতাংশ। জুলাই-অক্টোবরে নিট পোশাকের আয় ৬.৭৯ শতাংশ বেড়ে ৭.৭৩ বিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাকের আয় ৪.৬০ শতাংশ বেড়ে ৬.০২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
পোশাকের বাইরের প্রধান খাতগুলোরও ভালো পারফরম্যান্স দেখা গেছে। অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ওষুধ রপ্তানিতে — ২৫.৬৭ শতাংশ। প্রথম চার মাসে এই খাতের আয় বেড়েছে ৩৬.৪৪ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি অক্টোবরে ৯.৬৪ শতাংশ এবং চার মাসে ২৪.৮৮ শতাংশ বেড়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে অক্টোবরে ৪.৭০ শতাংশ, চার মাসের হিসেবে ১২.৪৭ শতাংশ। তবে কৃষিপণ্য এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি এই সময়ে কমেছে।
**কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশি পণ্য**
গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই দেশের সবচেয়ে বড় বাজার। জুলাই-অক্টোবরে দেশটিতে রপ্তানি ১১.৫১ শতাংশ বেড়ে ৩.৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাজ্য (১.৭৪ বিলিয়ন ডলার), তারপর জার্মানি (১.৫৭ বিলিয়ন ডলার) ও স্পেন (১.৫২ বিলিয়ন ডলার)। স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ১৩.৫৭ শতাংশ। বড় গন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি তুরস্কে — সেখানে রপ্তানি ৮২.৬৯ শতাংশ বেড়ে ২৯.২১৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ১৫.৯৯২ কোটি ডলার।
**প্রবাসী আয়েও সুখবর**
একই দিনের আরেকটি ইতিবাচক খবর প্রবাসী আয় নিয়ে। অক্টোবরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাঠিয়েছেন ২.৮৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই মাসের চেয়ে ১২.১৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছিল ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার। জুলাই-অক্টোবর চার মাসে প্রবাসী আয় ১৩ শতাংশ বেড়ে ১১.৪৬৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে; আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০.১৪৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলছেন, টানা পাঁচ মাস ধরে মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকছে — এর আগে টানা ছয় মাস (ডিসেম্বর-মে) ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছিল। এর পেছনে হুন্ডি নাকি অন্য কোনো কারণ — তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে — ৩৬.৫১৮ কোটি ডলার (মোটের ১৭.০৯ শতাংশ); দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (২০.১৬৫ কোটি ডলার)।
**'প্রবৃদ্ধি কাগজে, বাস্তবে নয়' — উদ্যোক্তাদের মত**
তবে এই প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে পুরোপুরি সত্য বলে মানতে নারাজ পোশাক উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মো. ফজলে শামীম এহসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, প্রকাশিত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাস্তব চিত্র প্রতিফলন করে না। তাঁর দাবি, গত এক বছরে কাঁচামাল আমদানির খরচ ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে, মজুরি বাড়াতে হয়েছে ৯ শতাংশ — এই হিসেবে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি আসলে ঋণাত্মক।
প্রেক্ষাপটটাও মনে রাখা দরকার। একই দিনে পোশাকখাতের শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনা চলছে — গত কয়েকদিনের অস্থিরতায় শত শত কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে খবর এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও উদ্যোক্তারা বলছেন, খাতটি স্থিতিশীল না হলে এই ধারা ধরে রাখা কঠিন হবে। রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য পোশাকখাতের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা এখন সবচেয়ে জরুরি।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।