মজুরি বোর্ড গঠন হলো, কিন্তু শ্রমিকদের পকেটে এখনও কিছু নেই
পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে সরকার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে — এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বোর্ড গঠন কোনো সমাধান নয়; শ্রমিকদের দাবির প্রতিফলন ঘটিয়ে দ্রুত ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণই আসল পরীক্ষা। দীর্ঘসূত্রতা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানিও।
বোর্ড গঠন প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র, সমাধান নয় — আসল পরীক্ষা এখনও বাকি
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে অবশেষে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ছয় সদস্যের এই বোর্ড এখন নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করবে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রধান দাবির মুখে সরকারের এই পদক্ষেপকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখি। কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা দরকার — বোর্ড গঠন কোনো সমাধান নয়; এটি কেবল একটি প্রক্রিয়ার শুরু। শ্রমিকদের পকেটে বাড়তি বেতন না পৌঁছানো পর্যন্ত এই সংকট মিটেছে বলে দাবি করা যাবে না।
প্রেক্ষাপটটা মনে রাখা জরুরি। পোশাকখাতে বর্তমান ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি ৩০ হাজার টাকা — বর্তমানের দ্বিগুণেরও বেশি। গত কয়েক মাস ধরে চলা আন্দোলন গত সপ্তাহে তীব্র রূপ নেয়। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন; কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয় বলে খবরে বলা হয়েছে। আশুলিয়ার প্রায় ৩০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ বোর্ড গঠনের ঘোষণা আসার পরও আন্দোলন থামেনি — হাজারো শ্রমিক রাস্তায় রয়ে গেছেন। এই বাস্তবতাটাই বলে দিচ্ছে, ঘোষণায় তাদের আস্থা নেই; তারা ফল চান।
কেন শুধু বোর্ড গঠন যথেষ্ট নয়
মজুরি বোর্ড একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া — শুনানি হবে, পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা হবে, তারপর সুপারিশ চূড়ান্ত হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এই প্রক্রিয়া শেষ হতে মাসের পর মাস লেগে যেতে পারে। অথচ শ্রমিকদের দাবি এখনই বাস্তবায়নের — তাদের যুক্তি, বর্তমান বাজারদরে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানো কঠিন। খবরে বলা হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি ও পারিবারিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় পেয়েছে। অন্যদিকে মালিকপক্ষেরও যুক্তি আছে — উৎপাদন খরচ বাড়ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া দাম সেভাবে বাড়ছে না। এই দুই পক্ষের মাঝে বোর্ডকে ন্যায্য একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, এবং তা দ্রুত।
দীর্ঘসূত্রতার ঝুঁকিটা শুধু শ্রমিকদের নয়, পুরো অর্থনীতির। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি চালান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পেমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে, যা প্রস্তুতকারক ও শ্রমিক — উভয়ের জন্যই আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে। পোশাকখাত দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এই খাত অস্থির থাকলে ক্ষতিটা জাতীয় অর্থনীতিরই।
যা করা দরকার
প্রথমত, বোর্ডের কাজের জন্য স্পষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা দরকার। অনির্দিষ্টকালের প্রক্রিয়া শ্রমিকদের আস্থা ফেরাবে না। দ্বিতীয়ত, শুনানি ও আলোচনা হতে হবে স্বচ্ছ — শ্রমিক প্রতিনিধিদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, নামমাত্র প্রতিনিধিত্বে কাজ হবে না। তৃতীয়ত, চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণার আগ পর্যন্ত শ্রমিকদের জন্য কোনো অন্তর্বর্তী স্বস্তির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা ভেবে দেখা উচিত। চতুর্থত, আন্দোলনরত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সংযম বজায় রাখতে হবে — বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে, শান্ত হবে না। আর সবশেষে, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে সংলাপের টেবিলে বসতে হবে; রাস্তার সংঘাত কারও স্বার্থ রক্ষা করে না।
এই সংকটে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগও উঠেছে — খবরে বলা হয়েছে, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের নেপথ্যে রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে এই সন্দেহের আড়ালে ঠেলে দেওয়া যাবে না। দাবি আদায়ের পথ শান্তিপূর্ণ রাখার দায়িত্ব যেমন শ্রমিক সংগঠনগুলোর, তেমনি দাবি মেটানোর দায়িত্ব সরকার ও মালিকপক্ষের। উভয় পক্ষ দায়িত্বশীল হলে তৃতীয় পক্ষের খেলার সুযোগই থাকবে না।
মজুরি বোর্ড গঠনকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু সরকারকে বুঝতে হবে — শ্রমিকরা বোর্ড চাননি, তারা ন্যায্য বেতন চেয়েছেন। বোর্ড সেই বেতনের পথ মাত্র। এই পথ কত দ্রুত ও কত ন্যায্যভাবে পাড়ি দেওয়া হয়, সেটাই নির্ধারণ করবে এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসে সফল হবে, নাকি আরেকটি দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জেড নিউজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।