বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

মজুরির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে, বন্ধ ৩০৬ পোশাক কারখানা

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টা নাগাদ ৩০৬টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, এতে প্রায় ৭ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রফতানির পিক সিজনে এই অচলাবস্থা দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতের জন্য বড় ঝুঁকি।

শেয়ার করুন
মজুরির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে, বন্ধ ৩০৬ পোশাক কারখানা

চার দিনের বিক্ষোভে অচল রফতানিমুখী কারখানা

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ শ্রমিকদের দাবি বর্তমান মজুরির প্রায় আড়াই গুণ।

দেশের রফতানিমুখী সবচেয়ে বড় এই শিল্পে টানা চার দিনের অচলাবস্থা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা এর আগেই সতর্ক করেছেন — অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে চলতি মাসের উৎপাদনের পাশাপাশি সামনের মৌসুমের রফতানি অর্ডারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বিজিএমইএর বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টা নাগাদ ৩০৬টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৭ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিজিএমইএর ২ হাজার ১৩৪টি সদস্য কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৮২৮টি কারখানা চালু ছিল।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গাজীপুর ও ময়মনসিংহে — এখানে ১৬১টি কারখানা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক। এছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানীতে ৯৩টি এবং ঢাকার মিরপুরে ৫২টি কারখানা বন্ধ ছিল। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবির ১২ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

সড়ক অবরোধের কারণে শুধু উৎপাদনই নয়, শিল্পাঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খলও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গাজীপুর-আশুলিয়া থেকে তৈরি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে দেরি হলে চালান নির্ধারিত সময়ের পর ছাড়তে পারে। চালান বারবার বিলম্বিত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সোমবারের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ

সোমবারের তুলনায় মঙ্গলবার বন্ধ কারখানার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। খবরে বলা হয়েছে, সোমবার প্রায় ৬৯০টি কারখানা বন্ধ ছিল এবং প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

দুই দিনের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখা যায়, প্রথম তিন দিনে পরিস্থিতি সবচেয়ে তীব্র ছিল; মঙ্গলবারে বন্ধ কারখানার সংখ্যা কমলেও অচলাবস্থা কাটেনি। প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষতি রফতানির চালানে বিলম্ব ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে সরকার ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে এখনো কোনো মজুরির পরিমাণ বা সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। গত ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে চলমান অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করেন। মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হলেও শ্রমিকপক্ষের দাবি — দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।

শ্রমিকদের যুক্তি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় তিন বছর আগে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকায় আজকের বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, রফতানি অর্ডার কমে যাওয়া, ক্রেতাদের দাম না বাড়ানো এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের মুনাফা চাপের মুখে।

অস্থিরতার সময়টা শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক অর্ডার সিজনে কারখানাগুলো বছরের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্ডার নিশ্চিত করে। এই সময়ে উৎপাদন বন্ধ থাকলে রফতানির চালান বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

রফতানি অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কার আশঙ্কা

তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি, জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কর্মরত। ফলে এই খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ধাক্কা দিতে পারে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পিক সিজনের এই গতিতে এখন ছেদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে — সিদ্ধান্তটি গত ২৯ অক্টোবর নেওয়া হয়। বাড়তি এই প্রস্তুতি সময় রফতানি বাণিজ্যে স্বস্তি দেবে; তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দূর না হলে সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিজিএমইএ, রয়টার্স।

খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

পাঠকের মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য সম্পাদকের অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়। শালীন ও বিষয়ভিত্তিক থাকুন।

প্রকাশ করা হবে না।

আমরা নিজেদের প্রতিবেদনের জন্য পেজভিউ ও ভিজিট গণনা করি, তবে শুধু আপনি মেনে নিলে। না বললে গণনা বন্ধ থাকে। বিস্তারিত