ইরানের কেশম দ্বীপে ভোরে বিস্ফোরণের শব্দ, 'মার্কিন হামলার' দাবি সংবাদমাধ্যমের
মঙ্গলবার ভোরে দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপ ও বন্দর লেঙ্গেহ (হরমোজগান প্রদেশ) এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়ে আসছে; হতাহতের তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
হরমোজগান প্রদেশের কেশম ও বন্দর লেঙ্গেহ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ; হতাহতের তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপ ও বন্দর লেঙ্গেহ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, কেশমে অন্তত পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ফার্স নিউজের খবরে বলা হয়েছে, বন্দর লেঙ্গেহতে সমুদ্রের দিক থেকে বিস্ফোরণের শব্দ এসেছে। দুটি এলাকাই হরমুজ প্রণালি-সংলগ্ন হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত।
বিস্ফোরণের ঘটনা ইরানি সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করলেও তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়ে আসছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এগুলোকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছে — হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাহাজে হামলা বা হুমকি থেকে ইরানকে বিরত রাখাই উদ্দেশ্য। আনাদোলু সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনেও একই বক্তব্য উঠে এসেছে।
উল্লেখ্য, "মার্কিন হামলা"র এই দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন; ইরানের পক্ষ থেকে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পেছনের প্রেক্ষাপট
জানা গেছে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়; এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হয়। পরে ১৮ জুন হরমুজে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও তা বাস্তবায়ন থমকে আছে। কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত আছে — ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সম্প্রতি দোহা সফর করেছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা জিতেছি।" তিনি নতুন করে বড় সংঘাতের আশঙ্কাও খাটো করে দেখেন। উল্লেখ্য, আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ পরিবহন হয়; এই এলাকায় যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রণালির গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-করিডোর। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে জাহাজের বীমা-খরচ বাড়ে, পরিবহন-ব্যয় বাড়ে — যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দামে পড়ে। সে কারণে কেশমের মতো প্রণালি-সংলগ্ন এলাকায় যেকোনো বিস্ফোরণের খবরই আন্তর্জাতিক বাজারে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হলে আমদানি-ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্স-প্রবাহ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এমন পরিস্থিতিতে। তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো নিশ্চিত তথ্য নেই — পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক তৎপরতা
উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির সাম্প্রতিক দোহা সফর সেই প্রক্রিয়ারই অংশ। জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলে হরমুজে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের দিনে উত্তেজনা
আজ যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন — এই প্রেক্ষাপটে ইরান-ইস্যুতে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার নতুন সংঘাতের আশঙ্কা খাটো করে দেখালেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে দুই পক্ষেরই সংযম ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর। নতুন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
সূত্র: ইরনা, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আনাদোলু।
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।