প্রতিশ্রুতি থেকে বিনিয়োগ: পাঁচ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন
ইউএস ট্রেড শোর মঞ্চে অ্যামচ্যাম পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে — তবে সভাপতির নিজের সতর্কতাই এই সম্পাদকীয়ের ভিত্তি: প্রতিশ্রুতি ঘোষণা সহজ, বাস্তবে রূপ দিতে হলে জ্বালানি, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও লজিস্টিকের সংস্কার জরুরি।
ট্রেড শোর মঞ্চে বড় অঙ্কের লক্ষ্য ঘোষণা সহজ; কিন্তু বিনিয়োগ পেতে হলে মজবুত করতে হবে জ্বালানি, অনুমোদন ও লজিস্টিকের ভিত
ঢাকায় ফিরছে ইউএস ট্রেড শো, আর ফিরছেই বেশ বড় এক প্রতিশ্রুতি নিয়ে। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) ঘোষণা দিয়েছে — আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাই তাদের লক্ষ্য। ৫ থেকে ৭ নভেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বসছে ৩০তম ইউএস ট্রেড শো, যেখানে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান ৬৩টি বুথে অংশ নিচ্ছে।
সংখ্যাটি চমকপ্রদ। আরও চমকপ্রদ হলো, এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, "পুরো পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগই বাস্তবে আসবে — এমন দাবি আমরা করছি না। তবে এই ট্রেড শো সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।" এই সতর্কতাই আসলে এই সম্পাদকীয়ের প্রাণ — কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিশ্রুতির অভাব কখনোই ছিল না; অভাব ছিল বাস্তবায়নের।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এসেছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আগামী পাঁচ বছরে সেই ১৫ বছরের সমান বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ১০ থেকে ১২টি মার্কিন কোম্পানিকে দেশের বাজারে আনার কথাও বলেছে অ্যামচ্যাম। উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রশংসনীয় — তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বাস্তবতার মাঝের ফারাকটা ঠিক কোথায়, তা জানা জরুরি।
প্রতিবন্ধকতাগুলো পুরনো, সমাধানও জানা
ট্রেড শোর ছয়টি সেমিনার ও বিশেষায়িত জোনের তালিকাটিই বলে দিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার কোথায় — বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আইটি ও ডিজিটাল অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, উৎপাদন ও লজিস্টিকস। এই খাতগুলোর প্রতিটিতেই বাংলাদেশের দুর্বলতা বহুল আলোচিত: শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, বন্দর-লজিস্টিকসের ধীরগতি।
কোনো ট্রেড শোর বুথে দাঁড়িয়ে একজন বিনিয়োগকারী যে প্রশ্নগুলো করবেন, সেগুলো নতুন নয় — গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন তো? কারখানার অনুমতি কত দিনে? পণ্য বন্দর থেকে বেরোতে কত সময় লাগবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত দিন সন্তোষজনক না হবে, তত দিন বড় অঙ্কের লক্ষ্য কাগজেই থেকে যাবে।
তবে আশার দিকও আছে। অ্যামচ্যামের সভাপতির সৎ স্বীকারোক্তি — লক্ষ্য ঘোষণা আর বাস্তবায়নের দাবি এক নয় — এই সততাই প্রথম পদক্ষেপ। আর ট্রেড শোর মতো মঞ্চে ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের এক টেবিলে বসার সুযোগই সংস্কারের চাপ তৈরি করে।
প্রতিশ্রুতি থেকে বিনিয়োগের দূরত্বটা আসলে নীতির দূরত্ব। পাঁচ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্নের উত্তর তাই ট্রেড শোর বুথে নয় — জ্বালানি নীতি, এক-জানালা সেবা আর বন্দরের দক্ষতায়।
নতুন কোম্পানি মানে নতুন কর্মসংস্থান
অ্যামচ্যামের আরেকটি লক্ষ্য — ১০ থেকে ১২টি নতুন মার্কিন কোম্পানি আনা — সংখ্যায় ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য বড়। একটি বহুজাতিক কোম্পানির কারখানা বা সেবাকেন্দ্র মানে শুধু বিনিয়োগ নয়; এর সঙ্গে আসে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সরবরাহ-শৃঙ্খলে স্থানীয় অংশীদারত্ব এবং হাজারো কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের তরুণ কর্মশক্তির জন্য এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে।
তবে এখানেও সেই একই শর্ত — কোম্পানিগুলো আসবে তখনই, যখন তারা দেখবে জমি, জ্বালানি ও অনুমোদনের নিশ্চয়তা আছে। ট্রেড শোর বুথে আগ্রহ তৈরি হয়; কিন্তু চুক্তি হয় বোর্ডরুমে, আর বোর্ডরুমে সিদ্ধান্ত হয় ঝুঁকি-হিসাব করে। বাংলাদেশকে সেই হিসাবে জিততে হবে।
সংস্কারের জানালা
ইতিবাচক দিক হলো, অর্থনৈতিক সংস্কারের আলোচনা এখন সক্রিয়। ট্রেড শোর সেমিনারগুলোতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা হবে, সেখানে নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতি সংস্কারের চাপকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। বিনিয়োগকারীদের মুখোমুখি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চাপই অনেক সময় নীতি বদলের সবচেয়ে কার্যকর প্রণোদনা।
পাঁচ বিলিয়ন ডলার — সংখ্যাটি বড়, কিন্তু অসম্ভব নয়। গত ১৫ বছরে যা এসেছে, তা-ই আগামী পাঁচ বছরে আনার লক্ষ্য মানে বার্ষিক গতি তিন গুণ বাড়াতে হবে। এটা সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের যন্ত্রটিও ঠিক করা হবে। অ্যামচ্যামের সভাপতি সততার সঙ্গে সেই সত্য স্বীকার করেছেন; এখন পালা সেই সত্যকে কাজে লাগানোর।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। (বিশ্লেষণ: সম্পাদকীয় বিভাগ; উদ্ধৃত তথ্য দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া।)
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।