মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় ডেমোক্র্যাটদের, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাল ট্রাম্পের দল
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলাফল ঘোষণা হয়েছে বুধবার (৪ নভেম্বর)। টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে দলটি; হাকিম জেফ্রিস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে। ইরান যুদ্ধ ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়কে পরাজয়ের বড় কারণ হিসেবে স্বীকার করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ঐতিহাসিক জয়; প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকারের পথে হাকিম জেফ্রিস
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বুধবার (৪ নভেম্বর) ঘোষণা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের—নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা কমপক্ষে ৫৪-৪৪ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় আসন ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস) ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ২৫টি আসন বাড়িয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে হাকিম জেফ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে এগিয়ে গেছেন বলে খবরে বলা হয়েছে।
জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস বসার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা পর্যালোচনার সুযোগ পাবে বলে খবরে বলা হয়েছে।
তিন রাজ্যে যুগান্তকারী ফল
টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল টেক্সাস। একই সঙ্গে তিন মেয়াদের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
কানসাসে মহামন্দা (গ্রেট ডিপ্রেশন) যুগের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। এই ফলাফল রাজ্যটির রাজনীতিতে একটি যুগের পরিবর্তন বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে-বাছাই করা প্রার্থীকে পরাজিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প এই রাজ্যে প্রায় ১৮ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে দুটি রাজ্যের ফলাফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলাস্কা ও মিসিসিপির সিনেট আসনের ফল ঘোষণা বাকি রয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। এই দুটি আসনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫৬-৪৪-এ পৌঁছাতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, এই তিন রাজ্যের ফলাফলই সিনেটে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে; বাকি দুটি আসনে জয় পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বাড়বে।
ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ইরান যুদ্ধ
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ তাঁর দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে তিনি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার ও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে খবরে বলা হয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পরাজয়ের দায় দিয়েছেন ট্রাম্পের ফেব্রুয়ারির সিদ্ধান্তের ওপর—ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালানো। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তই ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটারদের ক্ষোভের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ব্যয়বহুল শুল্ক ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিও মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের ব্যয় ও প্রশাসনের শুল্কনীতি সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি চাপ তৈরি করেছে।
ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস বসার আগেই আট মাসের ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য। তিনি সতর্ক করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ-ক্ষমতা প্রস্তাবের (ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন) আওতায় আরও সামরিক অভিযান চ্যালেঞ্জ করবে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিকল্পনা করছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
অর্থনীতিতে নির্বাচনের প্রভাব
নির্বাচনের ফলাফলের জেরে অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে। টানা তৃতীয় সেশনে তেলের দাম কমেছে বলে জানিয়েছে ডিটিএন (৪ নভেম্বর)।
অন্যদিকে, কাতারের মধ্যস্থতায় তাজা প্রস্তাবগুলো এখন পর্যালোচনা করছে ইরান ও ওয়াশিংটন। তবে ইরানি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, দুই পক্ষ এখনো চুক্তি থেকে অনেক দূরে রয়েছে। এই অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন কংগ্রেসের আকার নেওয়া ওয়াশিংটনের ইরান-নীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে খবরে বলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে বিরোধী-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করার চ্যালেঞ্জ এখন প্রেসিডেন্টের সামনে।
সূত্র: রয়টার্স, চ্যানেল ২৪, দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।