বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদে প্রয়োজনীয় ২১৮ আসন পেরিয়ে অন্তত ২১৯ আসনে নিশ্চিত জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। মিশিগান, টেক্সাস, আইওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনাসহ প্রথাগত রিপাবলিকান শক্তঘাঁটিতেও বড় জয় এসেছে তাদের। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সামনের দুই বছর কী অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।

শেয়ার করুন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবন, ওয়াশিংটন ডিসি

প্রতিনিধি পরিষদে ২১৯ আসন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ, সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঐতিহাসিক ধাক্কা খেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। দেশটির কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুটোতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীনরা, আর ক্ষমতায় ফিরেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।

ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয়

প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলোতেই এবার ভোট হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সীমা পেরিয়ে গেছে—দলটি নিশ্চিত করেছে অন্তত ২১৯টি আসন, যা নিম্নকক্ষের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দিয়েছে।

সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ৩৫টিতে। সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। ফলে পরের দুই বছর কংগ্রেস কোন দলের হাতে থাকবে—সে প্রশ্নের জবাব এখন পরিষ্কার: দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের রাজত্ব।

রিপাবলিকান শক্তঘাঁটিতেও ভাঙন

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় এসেছে এমন কয়েকটি রাজ্য থেকে, যেগুলো প্রথাগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মিশিগান, টেক্সাস, আইওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও এবং মেইন—এসব ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে বড় জয় তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এগুলোর মধ্যে টেক্সাস ও ওহাইওর মতো রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত ছিল।

দুই কক্ষই হাতছাড়া হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে। এসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বদলে দেয়নি—ভোটারদের মনোভাবেরও বড় বদলের ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রথাগত রিপাবলিকান শক্তঘাঁটিগুলোতে বিরোধী দলের এমন জয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাসে বিরল নয়, কিন্তু একযোগে ছয়টি ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে এ ধরনের ফল নিঃসন্দেহে ক্ষমতাসীনদের জন্য সতর্কবার্তা।

২০১৮-এর ছায়া, ২০২৬-এর বাস্তবতা

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও একই ধরনের ফল এসেছিল। ২০১৮ সালে তার দল ৪২টি আসন হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে ধাক্কাটা আরও বড়—প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি সিনেটও চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা সেই চেনা 'মিডটার্ম পেনাল্টি'রই আরেকটি অধ্যায়।

প্রেসিডেন্টের শাস্তি: 'মিডটার্ম পেনাল্টি'

রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই প্রবণতার নাম 'প্রেসিডেন্টের পেনাল্টি' বা 'মিডটার্ম পেনাল্টি'। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত আসন হারায়—এটাই দীর্ঘদিনের রীতি।

১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৮টিতেই ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদের আসন কেড়ে নিয়েছে। গড়ে ক্ষমতাসীন দল হারিয়েছে ২৬টি আসন। এ ধারার একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৮ সাল—বিল ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাটরা তখন আসন হারায়নি—এবং ২০০২ সাল, যখন জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকানরাও আসন হারায়নি।

ইতিহাসের বড় পরাজয়গুলো

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছিল ২০১০ সালে—বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের ৬৪টি আসন হারিয়েছিল। এর আগে ১৯৯৪ সালে ক্লিনটনের দল হারিয়েছিল ৫৪টি আসন। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রিপাবলিকানরা ৪২টি আসন হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। আর ২০২২ সালে জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়িয়ে নিয়েছিল।

সিনেটের হিসাব ভিন্ন

সিনেটের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। ১৯৪৬ সাল থেকে ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৩টিতেই প্রেসিডেন্টের দল সিনেটে আসন হারিয়েছে; কিন্তু মাত্র ছয়বার—১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০৬ ও ২০১৪ সালে—সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে।

আসন হারানো আর নিয়ন্ত্রণ হারানো যে এক নয়, তার উদাহরণ আছে ইতিহাসে। ১৯৮৬ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র ৪টি আসন হারিয়েছিল, কিন্তু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেছিল। আর ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদ হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়িয়ে নিয়েছিলেন।

কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণের মানে কী

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ যে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ণায়ক। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে তা প্রথমে দুই কক্ষেই পাস হতে হবে, তারপর সেটি প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে দলটি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারে এবং এমনকি অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারে। আবার সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে দলটি প্রেসিডেন্টের মনোনীত প্রার্থীদের—এমনকি আজীবন মেয়াদের ফেডারেল বিচারকদের—নিয়োগ আটকে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

সূত্র: টিবিএস।

খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

পাঠকের মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য সম্পাদকের অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়। শালীন ও বিষয়ভিত্তিক থাকুন।

প্রকাশ করা হবে না।

আমরা নিজেদের প্রতিবেদনের জন্য পেজভিউ ও ভিজিট গণনা করি, তবে শুধু আপনি মেনে নিলে। না বললে গণনা বন্ধ থাকে। বিস্তারিত