তহবিল সংকটের ধাক্কায় কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে জাতিসংঘের তহবিল সংকটের ধাক্কা লাগছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করেছে, তহবিল কমে যাওয়ায় প্রায় ১২ লাখ শরণার্থীর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আশ্রয়ের মতো অপরিহার্য সেবা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অপর্যাপ্ত তহবিলে ঝুঁকিতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা
জাতিসংঘের তহবিল সংকটের ধাক্কা লাগছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। আল-জাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারীরা তীব্র তহবিল সংকটের বোঝা টানছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, মানবিক ও উন্নয়ন তহবিলে তীব্র ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অপরিহার্য সেবা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ বছরের জুনে জেনেভায় এক ব্রিফিংয়ে সংস্থার মুখপাত্র বাবর বালোচ সতর্ক করেন, তহবিল কমে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে জাতিসংঘ ও এর অংশীদাররা ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে জরুরি মানবিক চাহিদা মেটাতে ৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের আবেদন জানায়। এই অঙ্ক আগের বছরের চাহিদার চেয়ে ২৬ শতাংশ কম, যা মানবিক চাহিদা কমার নয় বরং তীব্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন বলে জানিয়েছে সহায়তা সংস্থাগুলো।
অপরিহার্য সেবায় ঘাটতির আশঙ্কা
ইউএনএইচসিআরের আশঙ্কা, কমিয়ে আনা বাজেটে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী সহায়তা — খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পয়ঃনিষ্কাশন — মেটানো সম্ভব হবে। শরণার্থীরা প্রায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তহবিল ঘাটতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইন রাজ্যে পুনরায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এতে ইতোমধ্যে জনবহুল শিবিরগুলোতে ভিড় ও চাপ আরও বেড়েছে, আর তহবিল সংকটে মানবিক প্রবেশাধিকার ও সহায়তার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।
ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, অতিরিক্ত তহবিল না মিললে নিবন্ধন, সম্প্রদায়ভিত্তিক সুরক্ষা, শিশুসুরক্ষা মামলা ব্যবস্থাপনা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের বিশেষ সহায়তার মতো সেবা ব্যাহত হতে পারে।
সহায়তার ঘোষণা
এর মধ্যে আশার আলো হিসেবে ১৮ অক্টোবর জার্মানি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ২০ লাখ ইউরো (২২ লাখ ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ও জার্মানি স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় দুই জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জোরদারে কাজ করা হবে।
এই নতুন অঙ্গীকারের ফলে শেড (SHADE) প্রকল্পে জার্মানির মোট সহায়তা দাঁড়াল ৭০ লাখ ইউরো (৭৮ লাখ ডলার)। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং জার্মানির আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, বর্তমানে তহবিলের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে; নইলে শিবিরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষার ঘাটতি আরও গভীর হবে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন, যাকে জাতিসংঘ গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ায় প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের সংকট গভীর হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বের মনোযোগ সরে যাচ্ছে। সেটেলমেন্ট সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (এসএসআই), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়া প্যাসিফিক রিফিউজি রাইটস নেটওয়ার্কের ওই প্রতিবেদনের নাম 'বিটুইন বর্ডার্স'।
প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে জুন মাসে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে পরিচালিত যৌথ মাঠপর্যায়ের মিশনের ভিত্তিতে। এতে অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতি জরুরি মানবিক তহবিলের ঘাটতি পূরণ, পুনর্বাসনের পথ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'কক্সবাজারের সংকট গভীর হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বের মনোযোগ সরে যাচ্ছে।'
ইউএনএইচসিআরের চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে ফেরত পাঠানোর (রিফুলমাঁ) ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন — যা প্রথম ত্রৈমাসিকের চেয়ে ৬৭ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮৩ শতাংশ বেশি। সংশোধিত ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় ২৩ শতাংশ কমানো হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা, ইউএনএইচসিআর, এসএসআই
পাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।